এক সপ্তাহ পার হলেই বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন। তার আগে কলকাতায় জয়া আহসান। শহরের এক রেস্তরাঁয় আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় নায়িকার কথায় উঠে এল তাঁর আগামী ছবি, আট ঘণ্টার কাজ নিয়ে তাঁর বক্তব্য। সেই সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে শিশুদের উপর নানা ধরনের নির্যাতনের প্রসঙ্গও। মতৃত্ব নিয়ে তাঁর একান্ত ভাবনা ঠিক কী, সেটাও অকপটে শোনালেন জয়া। প্রশ্ন: এ বার অনেকটা লম্বা সময় পরে কলকাতায় এলেন। জয়া:হ্যাঁ, মাঝে একটু বেশি সময় ঢাকায় ছিলাম। এ বার নিজের আসন্ন ছবি ‘ওসিডি’-র জন্য কলকাতায় এলাম। আমার অভিনীত অন্যতম প্রিয় কাজ বলতে পারেন এটা। প্রশ্ন: জয়া আহসান তা হলে এ বার ‘বাতিক’-এর জ্বালায় নাজেহাল, তাই তো? জয়া:হ্যাঁ, একেবারে তাই। এই ছবিটা করতে করতে আমি খুঁজতে শুরু করি, আমার মধ্যে কিসের বাতিক রয়েছে। ছবিটা করার সময় আমাদের পরিচালক সৌকর্যকে একাধিক বার জিজ্ঞেস করতাম, ‘‘আমার কিসে ওসিডি আছে?’’ প্রশ্ন: খুঁজে পেলেন সেটা আপনি? জয়া: হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি, নিখুঁত অভিনয় নিয়ে আমার ‘ওসিডি’ রয়েছে। খালি মনে হয় সব (অভিনয়) যেন এক রকম হয়ে যাচ্ছে। তার পর নিজেকেই যেন চ্যালেঞ্জ দিয়ে ফেলি, আবার বিরক্ত হয়ে যাই নিজের উপরেই। নিজেকে বলি, ‘‘আরে বাবা, আমি তো মানুষ! কিন্তু মন বোঝে না। খালি মনে হয়, আমি কি ভাল করতে পারছি? এটা ভাবতে ভাবতে মানসিক অসুস্থতার জায়গায় চলে যাই। আরও নিখুঁত, আরও নিখুঁত হতে গিয়ে নিজের উপর বাড়তি চাপ দিয়ে ফেলি। প্রশ্ন: এটা থেকে মুক্তির পথ ভাবলেন কিছু? জয়া:নাহ্! ঠিক মুক্তি নয়। তবে ভেবে দেখেছি, কোনও কিছু সুন্দর ভাবে মন দিয়ে করলেই চাপমুক্ত থাকা যায়। প্রশ্ন: কোনও চরিত্র হয়ে ওঠার জন্য জয়া আহসান কী ভাবে তৈরি করেন নিজেকে? জয়া:আমি যখন যে বিষয়ে কাজ করি, সেটা নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করি। ‘ওসিডি’ ছবিটা করার সময় ‘পিডোফিলিয়া’ নিয়ে রীতিমতো চর্চা করেছি। শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ কোন মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ, কী থেকে হয়— এগুলো না জানলে এমন বিষয় নিয়ে কাজ করাটা মুশকিল। এই ছবি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তাই প্রস্তুতিটা জরুরি। আসলে যেখানে শিশুরা জড়িয়ে থাকে, দায়িত্বটা অনেক বেড়ে যায়। তাই না? প্রশ্ন: এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে ‘এপস্টিন ফাইল’ নিয়ে আলোচনা চলছে। তাবড় সব ব্যক্তিত্বদের নাম উঠে আসছে ওই বিতর্কে। জয়া:হ্যাঁ, আসলে এটা তো একটা মানসিক ব্যাধি। একটা বাচ্চা দেখলে সাধারণ মানুষের মনে মায়া জন্মায়, স্নেহ জন্মায়। কিন্তু, কিছু মানুষের শিশুদের দেখলে যৌন আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। তাঁরা ওই শরীরের ভিতরটা দেখতে চায়। আসলে এটা তো একটা অসুস্থতা। এই ‘পিডোফিলিয়া’ বিষয়টা নিয়ে কিন্তু বাংলা ছবিতে এখনও পর্যন্ত কোনও কাজ হয়নি। সেটাও কিন্তু খুব দুর্ভাগ্যজনক। প্রশ্ন: শৈশবের সঙ্গে মিশে রয়েছে হিংসা, এই ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে মনের উপর কতটা চাপ পড়ে? জয়া:‘ওসিডি’ ও ‘পিডোফিলিয়া’— দুটোই স্পর্শকাতর বিষয়। এই ছবিতে আমার করা চরিত্রটা শৈশবে যৌন শোষণের শিকার এবং তার পরিণাম কী ভয়ঙ্কর হতে পারে, অভিনয় করতে গিয়ে সেটার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। তাই চাপ তো পড়েই। প্রশ্ন: বাস্তব জীবনে জয়ার সঙ্গে এমন কোনও ঘটনা ঘটেছে? জয়া:আমি আসলে শুনেছি। এই ধরনের যৌন শোষণের ঘটনা পরিবারের মধ্যেই বেশি হয়। তাই এই বিষয়টা নিয়ে সব সময় ঢাকাচাপা দিয়ে রাখতেই দেখেছি। আমি আমার অনেক ঘনিষ্ঠ মানুষের মধ্যে ‘ওসিডি’ও দেখেছি। প্রশ্ন: শিশুদের প্রতি মায়া প্রসঙ্গে মনে হল, জয়া আহসান কখনও মা হতে চাননি? জয়া:আমি তো নিজেকে মা-ই মনে করি। হয়তো আমি কাউকে জন্ম দিইনি। কিন্তু আমার সঙ্গে আমার পোষ্যদের যে সম্পর্ক কিংবা আমার বাড়ির গাছেদের, তাতে আমি নিজেকে মা বলেই ভাবি। ওদের সঙ্গে আমি কথা বলি, আমার সঙ্গে সময় না কাটালে গাছেরা মরে যায়, পোষ্যেরা কষ্ট পায়। আমি ওদের কথা বুঝতে পারি। আমার কলকাতার বাড়িতে এলে গাছগুলোর নতুন পাতা গজাতে দেখেছি। ওরা আমাকে দেখলে খুশিতে ঝলমল করে। জন্ম দিতে পারলেই কি সন্তানেরা মায়ের কাছে থাকে? আমি জগতের সকলের মা হয়ে থাকতে চাই, তার মধ্যেই আনন্দ, সারদাদেবীর মতো। প্রশ্ন: শিশুদের জন্য কতটা নিরাপদ এই পৃথিবী? জয়া:অসম্ভব অনিরাপদ। আমি চাইলে কিন্তু সন্তান দত্তক নিতে পারি। তার জন্য সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বাধা একটাই। একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনলে তার জন্য একটা নিরাপদ জায়গা করে দিতে হবে। কিন্তু মানুষ প্রতিনিয়ত ‘আমি আমি’ করে চলছে। প্রশ্ন: দুটো ব্যাধির কথা হচ্ছে। আরও একটা সামাজিক ব্যাধি ‘হোমোফোবিয়া’। আপনার এই প্রসঙ্গে অবস্থান কী? জয়া:আমার চারপাশে এমন মানুষও দেখেছি। আমি মনে করি, সম্পর্ক মনের মিলন, লিঙ্গের নয়। আসলে সবটাই ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। শারীরিক ভাবে স্ত্রী-পুরুষের এই পার্থক্যটা একটা অবয়ব। সবটাই মনের যোগাযোগ। প্রশ্ন: পর্দায় সমলিঙ্গের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে কী কোনও ছুতমার্গ রয়েছে জয়ার? জয়া:নাহ্, ওটা তো অভিনয়। যদি আমি দেখি, কোনও বিষয় অহেতুক উদ্দেশ্যে দেখানো হচ্ছে, তা হলে আপত্তি রয়েছে। এমন কিছু করতে চাই না, যেখানে মনে হবে আমাকে ভুল ভাবে ব্যবহার করা হল। প্রশ্ন: অনেকগুলো ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছেন, ৮ ঘণ্টার কাজের দাবির সঙ্গে কি একমত আপনি? জয়া:দেখুন, অভিনয়টা শুধু শারীরিক নয়। এই পেশায় শরীর ও মনকে সঙ্গে নিয়ে একাগ্রচিত্তে কাজটা করতে হয়। আর এই কাজটা কিন্তু সহজ নয়। আমি মনে করি, কাজের একটা নির্ধারিত সময় থাকা দরকার। ব্যক্তিগত জীবনে ভারসাম্য থাকলে তবেই একজন অভিনেতার কর্মজীবন সফল হয়। এই আট ঘণ্টার মধ্যে কিন্তু ভাল কাজ করা সম্ভব। আট ঘণ্টা কাজ করা মানে কোনও ভাবেই গুণগত মানের সঙ্গে আপোস করা নয়। প্রশ্ন: আপনি নিজে কখনও প্রযোজক-পরিচালকের কাছে এই দাবি রেখেছেন? জয়া:হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই বলে দিয়েছি, আমার কাজের শিফ্ট কিন্তু আট ঘণ্টার। আবার যখন প্রয়োজন হয়, তখন আট ঘণ্টার বেশিও কাজ করি। আমি কখনওই প্রযোজক, পরিচালককে বিপদে ফেলি না। আমি কাজের ক্ষেত্রে জেদাজেদিতে বিশ্বাসী নই। বরং গুণগত মানের দিকটা বজায় থাকল কি না সেই বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত। প্রশ্ন: আপনি কখনও নাচগানের মশলা মার্কা ছবিতে কাজ করবেন? জয়া:আমি তো স্বার্থপর! অভিনয় থেকে যত রকমের রস নিতে পারব সব করব। অভিনয় করাটা আমার কাছে একটা নেশার মতো। একটা জীবনে কতগুলো চরিত্র হয়ে বাঁচা যায় বলুন তো? এটা তো সবাই পারবে না, আমি পারি। মানে অভিনেতারা এই যাপনটা করতে পারে। আর এটার যে কি নেশা, যে করে সে-ই জানে। প্রশ্ন: কিন্তু এই যে যাপন, তা থেকে মোহাবিষ্ট হতে হতে আত্মকেন্দ্রিকও হয়ে যান কেউ কেউ? জয়া:হ্যাঁ, তা হয়। যে কোনও অভিনেতা কিন্তু নিজেকে নিয়ে মোহাবিষ্ট। আসলে অভিনয়টা আমার কাছে একটা অ্যাড্রিনালিন রাশ-এর মতো, সেটাই আমাকে আকর্ষণ করে। প্রশ্ন: আপনি নিজেকে নিয়ে গুগল করে দেখেন? জয়া:না, দেখি না। সময় হয় না, ইচ্ছে হয় না। লোকে বলে অনেক কথা। প্রশ্ন: লোকের তো জয়া আহসানের বয়স নিয়ে কৌতূহলের অন্ত নেই, আপনি কী বলবেন? জয়া:কেউ বলে আমার ৪০, কারও কাছে আমি ৫০, কেউ পৌঁছে দিয়েছে ষাটের দরজায়। আসলে আমি ছোট বয়স থেকে কাজ করছি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছি, খুব ভারী ভারী চরিত্রে কাজ করেছি আর অনেক বছর ধরে কাজ করছি। তাই যে যার মতো করে আমার বয়স ধরে নিয়েছে। প্রশ্ন: সমাজে কি সফল নারীদের বিড়ম্বনা বেশি? জয়া: আসলে মানুষ আজকাল মন্তব্য করতে ভালবাসে। আর সমাজমাধ্যম তো প্রতিদিন যেন হাস্যকর জায়গায় চলে গিয়েছে। তবে ‘সফল’ শব্দাটা বড্ড স্বার্থপর মনে হয়। আমি সার্থকতায় বিশ্বাসী। প্রশ্ন: এখন তারকারা ডিটক্স করছেন, জয়া কী ভাবে ডিটক্স করেন? জয়া:গাছের পরিচর্যা আমার কাছে থেরাপির মতো। তবে আমি মাঝেমধ্যে ‘মোবাইল ফাস্টিং’ করি। মোবাইল থেকে দূরে থাকি। এটা খুব ভাল ভাবে করতে পারি। সে সময় কেউ আমাকে পায় না। ইচ্ছাকৃত ভাবেই আড়ালে চলে যাই।
জয়া আহসানের আসন্ন ছবি'ওসিডি'এবং শিশু নির্যাতনের বিষয়ে কলকাতায় কথা বলেছেন
Ananda Bazar•

Full News
Share:
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Achira News.
Publisher: Ananda Bazar
Want to join the conversation?
Download our mobile app to comment, share your thoughts, and interact with other readers.