মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এজেন্ট?
তিনিই ডেকে এনেছিলেন এরাজ্যে বিজেপিকে। সেই সাম্প্রদায়িক বিজেপি, আরএসএস-এর হাতে বাংলাকে তুলে দিয়ে বিদায় নিলেন রাজ্যের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।তাঁর নামের পাশে কোনও শিল্প গড়ার প্রচেষ্টাকারীর সার্টিফিকেট থাকবে না। তাঁকে কোনও বক্রেশ্বর, হলদিয়ার জন্য মনে রাখবে না আগামী। মমতা ব্যানার্জিকে রাজ্যে বিজেপি-র এজেন্ট হিসাবেই বিবেচনা করবে ইতিহাস।ইতিহাসের কী আশ্চর্য পরিহাস। কালীঘাট রোডের সেই রাস্তা, মরনাপন্ন আদি গঙ্গার উপরের ছোট ব্রিজ একই রকম আছে। মমতা ব্যানার্জির বাড়ির গলি যেখানে এসে মিশেছে কালীঘাট রোডে, তার ঠিক উলটো দিকে গুপ্তা স্টোরস। সেই পবিড়ি, সিগারেটের দোকানও কিছুটা একই রকম ছিল। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ় মনে করিয়ে দিলেন প্রায় ২৬ বছর আগের এক বিকালের কথা। বললেন,‘‘সেদিন অটলবিহারী এসেছিলেন ওর(মমতা ব্যানার্জি) বাড়িতে। কত লোক। গলি, রাস্তা গিজগিজ করছে। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। সেদিন অটলবিহারী ওদের বাড়িতে মালপোয়া খেয়েছিলেন।’’ওই প্রৌঢ়র বাড়ি পাশের গলিতে, মন্দিরের দিকে। সেদিন তিনিও প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন, সোমবার যেখানে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু পার্থক্য কোথায়? এখন মমতা ব্যানার্জির বাড়ির গলির মুখ ঘিরে গার্ডরেল। সোমবারও তা ছিল। গার্ডরেলের আশেপাশে কলকাতা পুলিশের কর্মীরা ছিলেন যথারীতি দায়িত্বে, পাহারায়। কিন্তু রাস্তার পাশে তৃণমূলের কোনও কর্মী ছিলেন না। গার্ডরেলের ওপারে আর পাশের পটুয়া পাড়ার গলিতে এদিক ওদিক তৃণমূলের দলের কর্মীদের ছোটখাটো জটলা ছিল। শুধু উত্তাল ছিল অনেকগুলি বাইক, গাড়ি। তাতে চড়ে অটলবিহারী বাজপেয়ীর দলের কর্মীরা ‘জয় শ্রীরাম’ বলে চিৎকার করতে করতে যাতায়াত করছিল গোপালনগর মোড় থেকে হাজরা মোড়ের দিকে। তারা আবার ফিরছিল। যে পুলিশকে মমতা ব্যানার্জি ২০১২-র বইমেলায় বলেছিলেন ‘আপনাদের চাবকানো উচিত’, তাঁরই সহকর্মীরা ঠোঁটে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে উৎফুল্ল বিজেপি কর্মীদের যাওয়া আসা দেখছিলেন।হরিশ চ্যাটার্জি রোডের মুখে ঠায় দাঁড়ানো গাছটায় টাঙানো তৃণমূলের ফেস্টুনেই শুধু মমতা ব্যানার্জির মুখে হাসি। না, পুরোপুরি ঠিক হলো না। মমতা ব্যানার্জির বাড়ির পাশের সেই পটুয়া পাড়ার গলিতে একটু এগলেই ‘ভবানীপুর সরস্বতী স্পোর্টিং ক্লাব।’ সেই ক্লাবের পক্ষ থেকে রাস্তায় চার-পাঁচটি লম্বা গোছের প্ল্যাকার্ড ঝোলানো হয়েছিল। সেগুলি সোমবার সন্ধ্যাতেও ছিল। সেই প্ল্যাকার্ডে মমতা ব্যানার্জির হাসি হাসি মুখের ছবির নিচে লেখা ছিল ‘৪র্থ বারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য আগাম অভিনন্দন।’ ক্লাবঘরের টিভিতে চোখ রেখে দশ-বারো জন যুবক বসে ছিল ‘মিরাকল’-এর আশায়। ‘৪র্থ বারের মুখ্যমন্ত্রী’র সম্ভাবনা তখন তলিয়ে যাচ্ছিল সাখোয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ভিতর। মমতা ছুটে গেছিলেন। হয়তো শেষ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর হয়তো তখনও ভরসা ছিল যে, যেভাবে নিজের উপস্থিতিতে ভবানীপুর থানা থেকে দলের কর্মীকে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার কিছুদিনের মধ্যে, এদিনও নিশ্চিত পরাজয় থেকে নিজেকে নিজেই কেড়ে আনবেন।কিন্তু মমতা হেরে গেলেন। ব্যর্থ মমতা হারের নিশ্চিত গতি দেখে রাত সাড়ে ৭টা নাগাদ ফিরে এলেন সেই বাড়িতে, যেখানে নাকি তাঁর মাথার দিকে শিব রয়েছেন। তিনি কত বড় হিন্দু তা প্রমাণ করতে এই দাবি তিনি করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শবাহী সংবিধানকে সাক্ষী মেনে চলা বিদানসভায়।কিন্তু ‘শিব’-এর অধিকার যাদের তাঁর থেকে অনেক বেশি, তাঁদের কাছেই তাঁকে রেকর্ড হার মানতে হলো। তিনিই পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি পরপর দু’বার বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হলেন। প্রথমবার নন্দীগ্রামে, ২০২১-এ। দ্বিতীয়বার সোমবার, ভবানীপুরে। তিনিই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি উপনির্বাচন ছাড়া জিততে পারেননি। নন্দীগ্রামে হেরেছিলেন ১৯৩৬ ভোটে। ভবানীপুরে, নিজের পাড়ায় তাঁকে ১৫,১০৫ ভোটে হারিয়ে দিলেন সেই শুভেন্দু অধিকারী।কোন্ শুভেন্দু অধিকারী? যাঁর সঙ্গে মিলে নন্দীগ্রামে তিনি শুরু করেছিলেন সাম্প্রদায়িক খেলা। ‘সিপিএম বেছে বেছে মুসলমানদের জমি কেড়ে নিচ্ছে’, এই প্রচার শুরু ২০০৭-এর নন্দীগ্রামে। এই প্রচারের স্রষ্টা মমতা-শুভেন্দু। নন্দীগ্রামেই মাওবাদীদের সঙ্গে তৃণমূল-বিজেপি’র সরাসরি জোট। নন্দীগ্রামেই সিপিআই(এম)-কে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উৎখাতের ‘রাস্তা কাটা’ মডেল শুরু। গত দেড় দশকে বামপন্থীদের মেরে, গ্রাম ছাড়া করে, মিথ্যা কেস দিয়ে, গ্রেপ্তার করিয়ে দুর্বল করেছে মমতা ব্যানার্জির দলবল। বামপন্থীদের দুর্বল করে বিজেপি’র রাস্তা চওড়া করেছেন মমতা ব্যানার্জি।সেই সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতেই রাজ্যকে তুলে দিয়ে বিদায় নিলেন তিনি। মমতা এখন বৃদ্ধা, শরীর খারাপ। তাঁর যাবতীয় শক্তি করায়ত্ত করে বসেছে তাঁরই ভাইপো। সেই ভাইপো এদিন বিকালেই হেস্টিংস ভবনে ঢুকতে গিয়ে তাড়া খেয়েছেন বিজেপি কর্মীদের। অশ্রাব্য গালিগালাজ পেরিয়ে যদিও বা ‘যুবরাজ’ কিছুটা ঢুকেছিলেন, কিন্তু কমিশনের আধিকারিকরা পত্রপাঠ তাঁকে প্রায় তাড়িয়ে দিয়েছেন গণনা কেন্দ্র থেকে। কারন তার সেখানে যাওয়া বেআইনি। অভিষেক সোজা তাঁর বহুমূল্যবান গাড়ি থামিয়েছেন কালীঘাট মন্দিরের গেটের উলটো দিকে বিরাট অফিসের সামনে। নেমে সোজা সেই অফিসে সেধিয়েছেন, আর বেরোননি।মমতা ব্যানার্জি এদিন নিষ্ফল আক্রোশে দাবি করেছেন যে, ১০০টি গণনা কেন্দ্র বিজেপি লুট করেছে। অথচ ১৯৯৭-এর ১৬ ডিসেম্বর এই তিনিই সাংবাদিকদের বলেছিলেন,‘‘তৃণমূল কংগ্রেসের আসল লক্ষ্য যাবতীয় সিপিআই(এম) বিরোধী শক্তিকে এক জায়গায় জড়ো করা। বাংলা বাঁচাও ফ্রন্ট খোলা হচ্ছে সেই কারনেই। সিপিআই(এম) বিরোধী সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীকেই আমরা এই ফ্রন্টে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’’ আর সাম্প্রদায়িকতা? সেদিন সদ্য জাল ড. ডিগ্রি ঝেড়ে ফেলা মমতা ব্যানার্জি সেদিন বিজ্ঞর মতো জানিয়েছিলেন,‘‘ধর্মনিরপেক্ষতা নন-ইস্যু। বিজেপি অচ্ছুৎ নয়। এত লোক ওদের ভোট দিচ্ছে।’’আজও বিজেপি অনেক ভোট পেয়েছে। ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জি স্রেফ উড়ে গেছেন। আর? বাংলার রাজনীতিতে দিনের পর দিন বিজেপির পথে হেঁটে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে ‘নন-ইস্যু’ বানিয়ে দিয়ে গেলেন তিনিই।তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ, যার জন্য বাংলাকে ভুগতে হবে— দায়ী থাকবেন তিনি, মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর নীতিহীন একদল নেতা, কর্মী।