Achira News Logo
Achira News

জল সঙ্কটঃ শহর ও সম্প্রদায়ের জন্য এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ

Uttarbanga Sambad
জল সঙ্কটঃ শহর ও সম্প্রদায়ের জন্য এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ
Full News
Share:

তুহিনশুভ্র মণ্ডল In the beginning, When God created the universe, the earth was formless and desolate. The raging ocean that covered everything was engulfed in total darkness. The spirit of God was moving over the water. Then God commanded ‘let there be light’—and light appeared. বাইবেলের এই অমোঘ পংক্তিগুলো সৃষ্টির আদিলগ্নে জলের অপরিসীম গুরুত্বকে মহিমান্বিত করে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান—সবার মতেই জলই জীবনের স্পন্দন। কিন্তু আজ সেই সৃষ্টির উৎসটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে গভীর দুশ্চিন্তার কারণ। সাম্প্রতিক ‘অ্যাকোয়াডাক্ট ওয়াটার রিস্ক অ্যাটলাস’-এর রিপোর্ট আমাদের এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৩৮টি বড় শহর আজ চরম জলসংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে ভারতবর্ষের ১৭টি রাজ্য (২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে) রয়েছে চরম ঝুঁকির তালিকায়, যার মধ্যে আমাদের পশ্চিমবঙ্গও অন্যতম। উত্তরবঙ্গ সরাসরি এই তালিকার শীর্ষে না থাকলেও, সংকটের কালো মেঘ যে এই জনপদের আকাশে জমছে না, তা হলফ করে বলা যায় না। ভারতের প্রেক্ষাপট পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশের বাস এই ভারতবর্ষে। প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের এই বিশাল দেশে জলের চাহিদা গাণিতিক হারে বাড়ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মিষ্টি পানীয় জলের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ভারতের প্রায় ৭০০টি জেলার মধ্যে ২৫৬টি জেলা আজ ‘অতি সংকটজনক’ হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় ৪০ কোটি নগরবাসী আজ শুধু জলের অভাবেই নয়, বরং দূষিত জল ও পরিস্রুত পানীয় জলের প্রাপ্যতার বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা এবং শিল্প-কৃষির বিপুল চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমরা ভূপৃষ্ঠীয় এবং ভূগর্ভস্থ—উভয় প্রকার জলভাণ্ডারকেই প্রায় নিঃশেষ করে ফেলছি। টলছে পৃথিবীর ভারসাম্য জলের এই যথেচ্ছ ব্যবহার কেবল জীবনকেই সংকটে ফেলছে না, বদলে দিচ্ছে পৃথিবীর গতিপ্রকৃতিও। একটি চমকপ্রদ ভূ-বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গত ১৭ বছরে এই পৃথিবী থেকে প্রায় ২১৫০ বিলিয়ন টন জল তুলে নেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ভর স্থানান্তরের ফলে পৃথিবীর অক্ষরেখা পূর্ব দিকে প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার হেলে গিয়েছে। ভাবলে অবাক হতে হয়, আমাদের অপরিকল্পিত পাম্প ব্যবহার বা চাষের কাজে ভূগর্ভস্থ জল তুলে নেওয়ার জেদ খোদ গ্রহের ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করছে। এই সমস্যা ভারত ও আমেরিকায় সবচেয়ে প্রকট। ২০২২ সালের আইপিসিসি রিপোর্ট বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৪৪ কোটি শহরবাসী চরম জলকষ্টের শিকার হবেন। ১৯৭১ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে যে সংকটের শুরু হয়েছিল, তা এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বজুড়ে প্রভাব জল এখন আর কেবল জীবনের নাম নয়, জল এখন রাজনীতির দাবার চাল। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তেলের চেয়েও জলের গুরুত্ব বাড়ছে। বলা হচ্ছে, আগামীদিনের যুদ্ধগুলো হবে জল নিয়ে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদের জল নিয়ে সাম্প্রতিক বিবাদ এই বৈশ্বিক সংকটের নবতম সংযোজন। ভারতের অভ্যন্তরেও আমরা দেখেছি চেন্নাইয়ের সেই হাহাকার, যেখানে এক লিটার পানীয় জলের দাম ৪০০ টাকায় ঠেকেছিল। আস্ত ট্রেন ভর্তি করে জল পাঠাতে হয়েছিল শহরবাসীর তৃষ্ণা মেটাতে। কাবেরী নদীর জলবণ্টন নিয়ে তামিলনাডু ও কর্ণাটকের দীর্ঘকালীন বিবাদ, যেখানে কেরল ও পুদুচেরিও জড়িয়ে পড়েছে, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে জলসংকট কেবল পরিবেশগত নয়, বরং তা একটি তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ। আড়ালে এক মানবিক সংকট ভারত আজ বিশ্বের বৃহত্তম ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারকারী দেশ। প্রতি বছর প্রায় ২৫০ কিউবিক কিলোমিটার জল আমরা মাটির নীচ থেকে তুলছি, যা সমগ্র বিশ্বের ব্যবহারের এক-চতুর্থাংশের বেশি। এর প্রায় ৮৫ শতাংশ খরচ হচ্ছে কৃষিকাজে। বিদ্যুৎ ভরতুকি এবং আইনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যে জলস্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গিয়েছে। নীতি আয়োগের ২০১৮ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৬০ কোটি ভারতীয় আজ উচ্চ থেকে চরম জলকষ্টের মধ্যে বাস করছেন এবং প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ মারা যান শুধুমাত্র নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে। পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বেঙ্গালুরু, দিল্লি, হায়দরাবাদ ও চেন্নাইয়ের মতো ২১টি বড় শহর সম্পূর্ণ জলশূন্য হয়ে যেতে পারে। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি এক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ভারতে মোট রোগের ১০ শতাংশের উৎস হল দূষিত জল। ডায়ারিয়া বা ডিসেন্ট্রির মতো রোগে প্রতি বছর অসংখ্য শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই সংকট। উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় জল বোর্ডের (CGWB) ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গ ভৌগোলিকভাবে এখনও অনেকটা নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। এখানে জলস্তর সাধারণত ০-২ মিটার বা কোথাও ২-৫ মিটার গভীরে পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের বর্ষা-পরবর্তী বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে ৮.৪ শতাংশ বেশি হওয়ায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর কিছুটা পুষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই আপাত স্বস্তি কি স্থায়ী? উত্তরবঙ্গেও কি অপরিকল্পিত নগরায়ণ বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ নেই? ডুয়ার্স থেকে শুরু করে সমতল—সর্বত্র সবুজের পরিমাণ কমছে। জলাভূমি ভরাট করে গড়ে উঠছে বহুতল। মাটির নীচে জল যাওয়ার প্রাকৃতিক পথগুলো আমরা বন্ধ করে দিচ্ছি। ফলে গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ বা ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ ব্যাহত হচ্ছে। সিক্ত শিলাস্তর বা ‘অ্যাকুইফার’ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে অগভীর কূপগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন, কুমারগঞ্জ, হরিরামপুর কিংবা শিলিগুড়ি ও কালিম্পংয়ের জলসংকটগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? মোটেও না। শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলো আমাদের এক সুনির্দিষ্ট বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যখন দেখি পানীয় জলের জন্য পাহাড়ে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হচ্ছে মানুষকে, কিংবা কেউ নর্দমার জল ছেঁকে পান করছেন—তখন বুঝতে হবে ভবিষ্যৎ কতটা অন্ধকার। সমাধানের সন্ধানে সরকারি স্তরে ‘জল জীবন মিশন’, ‘অটল ভূজল যোজনা’, ‘নমামি গঙ্গে’ কিংবা রাজ্যের ‘জল ধরো জল ভরো’-র মতো প্রকল্পগুলো রয়েছে। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ বা বর্জ্য জলের পুনর্ব্যবহার নিয়ে সচেতনতা প্রসারের চেষ্টাও হচ্ছে। কিন্তু এসবের প্রকৃত প্রয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় ‘সাস্টেনেবল ক্রপিং প্যাটার্ন’ বা টেকসই ফসল চক্রের প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি। কবি ডব্লিউ এইচ অডেন বলেছিলেন, ‘হাজারে হাজারে প্রেমহীন জীবন কাটিয়েছে, কিন্তু একটিও জল ছাড়া নয়’। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিন্দু বিন্দু জল দিয়েই সিন্ধু গড়ে ওঠে, আর সেই বিন্দুর অপচয়ই আমাদের বিনাশ ডেকে আনবে। বালুরঘাটের শিশু কিশোর নাট্যদল ‘কথক’-এর সেই গানটি যেন আজ প্রতিটি মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়— ‘চল রে সবাই চল/জল কে বাঁচাই চল’। এই আহ্বান আজ আর কোনও নাটকের সংলাপ নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াই। আমরা কি সেই ডাক শুনতে পাচ্ছি? নাকি আরও এক মহাপ্রলয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি? (লেখক শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী)

Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Achira News.
Publisher: Uttarbanga Sambad

Want to join the conversation?

Download our mobile app to comment, share your thoughts, and interact with other readers.

জল সঙ্কটঃ শহর ও সম্প্রদায়ের জন্য এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ | Achira News