সাত্যকি রায়একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় পৃথিবীর উৎপাদন প্রক্রিয়া গভীরভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। মানুষ তার চারপাশের প্রকৃতিকে ক্রমাগত নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তিত করেছে। মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস এই কারণে প্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ শ্রমসনজাত মেধার মধ্যে দিয়ে নতুন প্রযুক্তি সৃষ্টি করেছে কায়িক শ্রমকে প্রতিস্থাপিত করার জন্যই। প্রযুক্তির প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে মানুষ তার কর্মদক্ষতাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলেছে। যে সমস্ত জিনিসপত্র সে অতীতে ব্যবহার করত তা অল্প সময় উৎপাদন করার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কখনো বা সম্পূর্ণ নতুন জিনিস সৃষ্টি করেছে যার ব্যবহার অতীতে মানুষের জানা ছিল না। আবার প্রযুক্তি পুঁজির চক্রের সময় কালকে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে অথবা সংযোগের অন্যান্য খরচগুলিকে ক্রমাগত কমিয়ে এনে। প্রযুক্তির ব্যবহার সাধারণভাবে মানুষের সরাসরি শ্রমকে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিচালিত হলেও তা সর্বদা বেকারত্ব তৈরি করবে এরকম কোনও কথা নেই। প্রাক আধুনিক যুগে রোম শহরে রাস্তাঘাট ও নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত করা। প্রযুক্তির ব্যবহার সে ক্ষেত্রে মূলত নাগরিকদের রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হতো। যে ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষকে কর্মচ্যুত করে রাজনৈতিক কারণেই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত শাসকেরা। কিন্তু এর ফলে নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব বন্ধ হয়ে যেত তা নয়। কোনও এক জায়গায় সেই প্রযুক্তির বিকাশকে রাজনৈতিক কারণে রুখে দিলে তা অনিবার্যভাবেই পৃথিবীর অন্য কোনও ভূখণ্ডে প্রয়োজনীয় হিসাবে আবির্ভূত হতো। এবং ধীরে ধীরে সেই প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসারিত হওয়ার কারণে প্রতিযোগিতার লক্ষ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা অনিবার্য হয়ে উঠতো। অতএব কোনও একটি সময় স্বল্প মেয়াদি কারণে কোনও দেশে কোনও একটি প্রযুক্তির বিকাশকে বন্ধ রাখলেও দীর্ঘ সময়ের বিচারে কারও পক্ষেই নতুন প্রযুক্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।পুঁজিবাদী সমাজে প্রযুক্তি শুধুমাত্র সভ্যতার বিকাশের হাতিয়ার নয় তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে তখনই যখনতা মুনাফা বৃদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হবে। পুঁজিবাদে প্রযুক্তির বিকাশ কিছুটা স্বতঃস্ফূর্ত। ব্যক্তিপুঁজিপতি অন্য পুঁজিপতিকে প্রতিযোগিতায় পরাস্ত করতে নিরন্তর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে থাকে। একটি সফল প্রযুক্তির প্রয়োগ কোনও শিল্প ক্ষেত্রের গড় মুনাফার হারের চেয়ে বেশি মুনাফা হার পুঁজিপতিকে এনে দেয়। কিন্তু যখনই নিযুক্ত নতুন প্রযুক্তি ঐ শিল্প ক্ষেত্রের গড় প্রযুক্তিতে পরিণত হয় তখন তা আর বাড়তি মুনাফা এনে দেবে না। ফলে ওই পুঁজিপতিকে অন্যদের চেয়ে বেশি মুনাফা করতে হলে আবার নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হয়। এই নিরন্তর প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং প্রত্যেক পুঁজিপতি নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে উৎসাহী হয়। এর মধ্যে দিয়ে উৎপাদনের সাধারণ দক্ষতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাধারণভাবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার যদি কর্মপ্রার্থী বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয় তাহলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত বেকারত্ব তৈরি হবে। পুঁজিবাদে সাধারণভাবে এই ঘটনাই ঘটে থাকে। তার কারণ হলো দক্ষতা বা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার সামঞ্জস্য তৈরি করার কোনও কাঠামোগত ব্যবস্থাপনা পুঁজিবাদে নেই। প্রযুক্তি ব্যবহারে অনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ এ কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্মহীনতার বিপদ তৈরি করে। প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে মুনাফার স্বার্থ সম্পর্কিত করে দেখতে পারার কারণেই মার্কস দেখাতে পেরেছিলেন শ্রমের মজুত বাহিনী পুঁজিবাদে কেন তৈরি হয় এবং তা মজুরি নিয়ন্ত্রণে কিভাবে পুঁজিপতিদের সাহায্য করে।মনে রাখা দরকার যে যন্ত্রের ব্যবহার অনিবার্যভাবে কর্মহীনতা তৈরি করবে এর কোনও মানে নেই। অনেক যন্ত্রই আবিষ্কৃত হয়েছে পৃথিবীতে যা মানুষের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে কিন্তু অনিবার্যভাবেই কর্মহীনতা তৈরি করেনি। ক্যালকুলেটর বা পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিশ্লেষণাত্মক সফটওয়্যার কর্মহীনতা তৈরি করেছে একথা বলা যায় না। দ্বিতীয় কথা হলো নতুন প্রযুক্তি যে ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে সেই প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু সহযোগী প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয় যা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যেমন ধরুন কম্পিউটারের ব্যবহার হার্ডওয়ারের চাহিদা তৈরি করেছে যা উৎপাদন করতে মানুষের নিয়োগ প্রয়োজন। এর অর্থ হলো নতুন প্রযুক্তি একদিকে যেমন শ্রমের প্রতিস্থাপন করে অন্যদিকে নতুন ধরনের কাজের সুযোগও সৃষ্টি করে। এখন প্রশ্ন হলো মোটের উপর ফলাফল কি হবে তা নির্ভর করে নতুন শিল্পটি কতটা শ্রমনিবিড় তার উপর, এবং অর্থনীতিতে এই অংশের উৎপাদনের অংশীদারত্ব কত? প্রযুক্তির বিকাশের ইতিহাসে এরকম অজস্র উদাহরণ রয়েছে যেখানে দেখা যাবে প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে সামগ্রিক কর্মসঙ্কোচন ঘটিয়েছে আবার অন্যান্য পর্যায়ে যোগ ও বিয়োগ মিলিয়ে মোটের উপরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বাষ্পশক্তিনির্ভর প্রথম প্রযুক্তি বিপ্লবে বিপুল পরিমাণে পুরুষ কারিগররা ছাঁটাই হয় এবং উনবিংশ শতাব্দীতে যে লুডাইট মুভমেন্ট গড়ে উঠে তার পরিপ্রেক্ষিতে এটাই ছিল। গোটা ইউরোপ জুড়ে মেশিন ভাঙার দাঙ্গা চলতে থাকে এবং তাকে দমন করতে বহু শ্রমিককে ফাঁসিতে পর্যন্ত ঝোলানো হয়। মেশিনের ব্যবহারের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিশ্রমের দক্ষতা কমাতে সাহায্য করে এবং মহিলা ও শিশু শ্রমিকের নিয়োগ বৃদ্ধি পায়। শিল্প বিপ্লবের সূচনায় ইংল্যান্ডে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ভয়ঙ্কর অবনমনের বর্ণনা মার্কস ক্যাপিটালের প্রথম খণ্ডে আলোচনা করেন। এঙ্গেলসও ইংরেজ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার নির্মম ইতিহাস তুলে ধরেন। সেই সময়ের বহু উপন্যাস শ্রমজীবীদের দুরবস্থা ও পরিবারের ভাঙনের সঙ্কটকে চিত্রায়িত করে। কিন্তু দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সময় আমরা অন্য একটা ছবি দেখতে পাই। এই শিল্প বিপ্লব মূলত বিদ্যুতের ব্যবহারের উপরে গড়ে ওঠে। বৈদ্যুতিন যন্ত্রের ব্যবহারও শ্রমকে প্রতিস্থাপিত করেছিল বেশ কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু উৎপাদনের আয়তন বৃদ্ধি পায় ফলে শিল্প ক্ষেত্রে সুপারভাইজার, ক্লার্ক,টাইপিস্ট এবং অন্যান্য সহযোগী পরিষেবা মূলক কাজের সুযোগ তৈরি হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার শ্রমের সচলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অটোমোবাইল শিল্প এবং তার অনুসারী শিল্প এই সময় বিশেষভাবে বিকশিত হয় যা বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করে। অন্যদিকে বিদ্যুতের ব্যবহার গৃহস্থালি ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে তোলে। রেফ্রিজারেটর,ইস্ত্রি, মেশিন, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদির ব্যবহার গৃহস্থালি কাজে প্রয়োজনীয় সময়কে কমিয়ে দেয়। এর ফলস্বরূপ বাইরের কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়। বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার কারখানায় শ্রমের পরিবেশকে অনেক অনুকূল করে তোলে। এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে শ্রমজীবী মানুষ বুঝতে পারে যে প্রযুক্তির ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদি সময়ে তাদের জীবন মানের উন্নতি ঘটিয়েছে। অতএব লড়াইটা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয় বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট লাভের বণ্টনের ব্যাপারে লড়াই নিবিষ্ট করা দরকার। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জয়েল মকির দেখিয়েছেন যে প্রযুক্তির বিকাশের ইতিহাস আসলে সংঘর্ষের ইতিহাস। প্রযুক্তির কারণে যে মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সে তার অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করবে এটাই স্বাভাবিক। এবং সেই লড়াইয়ের নিরসন শেষ বিচারে ঘটে। মূলত প্রযুক্তির ব্যবহারে যারা লাভবান তাদের লাভের অংশ থেকে কিছুটা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সমস্যার সুরাহা করার মাধ্যমে। গ্যাসবাতির ব্যবহার বৈদ্যুতিন বাতির দ্বারা প্রতিস্থাপিত হলে গ্যাসবাতি জ্বালানোর কাজে নিযুক্ত মানুষ কাজ হারাবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের জীবিকা রক্ষার দাবি তারা স্বাভাবিকভাবেই করবে। কিন্তু এই প্রশ্নটির মীমাংসা এভাবে করা অবাস্তব যে বৈদ্যুতিন বাতির ব্যবহার রুখে দিতে হবে বরং যেটা করা দরকার তা হলো ওই জীবিকা থেকে যারা উৎপাটিত হলো তাদের আয়ের বিকল্প ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা। এই বণ্টনের সংঘাতটা ঠিকমতো নিরসন না হলে প্রযুক্তির বিকাশ রুদ্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রাক আধুনিক যুগে চীন এবং পরবর্তী সময়ের ফ্রান্স এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে অতীতে গিয়েছে। পৃথিবীর একাধিক দেশের ইতিহাস এই সত্য তুলে ধরে যে সমাজ কত দক্ষতার সাথে প্রযুক্তির কারণে জয়ী ও পরাজিতদের মধ্যে প্রযুক্তির সাফল্যর বণ্টন ঘটাতে পেরেছে তার উপরে প্রযুক্তির জয়যাত্রা নির্ভর করেছে।আজকের পৃথিবীর নতুন প্রযুক্তি জ্ঞানকেন্দ্রিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই প্রযুক্তি প্রবাহের নতুন জেনারেল পারপাস টেকনোলজি হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে।অতীতের প্রযুক্তি সৃষ্টিতেও জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। অতীতের প্রযুক্তি মূলত মানুষের কায়িক শ্রমকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। আজকের প্রযুক্তি মানুষের মানসিক শ্রমের একটি অংশকে প্রতিস্থাপিত করছে। আজ থেকে দেড়শো বছরেরও বেশি আগে কাল মার্কস গবুন্ডরিসে এই আলোচনা করেছেন। এই উপস্থাপনা মার্কস করতে পেরেছিলেন এ কারণে নয় যে তিনি ভবিষ্যৎবাণী করতে চেয়েছিলেন— আসলে তিনি সভ্যতার উৎপাদিকা শক্তির বিকাশকে অনুধাবন করেছিলেন। মার্কস বলেছেন যে এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষের শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে কমে যাবে। যন্ত্রের উপর নজরদারি করাটাই তার প্রধান কাজ হয়ে উঠবে। শুধু তাই নয় জ্ঞান দ্বারা সৃষ্ট যন্ত্রপাতির উপরে শুধু পুঁজির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে তা নয় জ্ঞান-বিজ্ঞান নিজেই প্রধান উৎপাদিকা শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হবে। মানুষের মেধাই হবে প্রধান উৎপাদিকা শক্তি আর সেই মগজের উপরে পুঁজি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে। মার্কস এই আলোচনায় আরও বলেন যে উৎপাদনে শ্রমের নির্দিষ্ট অবদান এমত অবস্থায় অনেকটাই নির্ভর করবে তার নিজস্ব দক্ষতার উপরে নয় বরং সমাজের সাধারণ বুদ্ধিমত্তার (general intellect) উপরে। ফলে শ্রমিকের অবদান শ্রমঘণ্টা দিয়ে পরিমাপ করার পদ্ধতিটি ক্রমাগত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে— ধীরে ধীরে মূল্যের ধারণাটিও মানুষের সামাজিক অবদান পরিমাপের মাপকাঠি হিসাবে অকেজো হয়ে পড়বে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শ্রম ও পুঁজির পরিবর্তিত সম্পর্ক এর চাইতে প্রাঞ্জল অনুধাবন আর কি হতে পারে? নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার জ্ঞানকেন্দ্রিক এ কারণেই যে বস্তুর ব্যবহার মূল্যর পরিবর্তনে তার দৈহিক চেহারার পরিবর্তনের পরিবর্তে বৌদ্ধিক প্রক্রিয়ার অবদান অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ মোবাইল ফোনের দাম বৃদ্ধি পায় নতুন ফিচার যুক্ত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। সেক্ষেত্রে ফোনের যন্ত্রাংশের অথবা কাঁচামালের বিশাল পরিবর্তন ঘটে যায় তা নয়। পরিবর্তন ঘটে সফটওয়্যা রে যা আসলে একটি বৌদ্ধিক উপাদান যার প্রয়োগ ফোনের ব্যবহার মূল্য বাড়িয়ে তোলে। এই জ্ঞানকেন্দ্রিক উৎপাদনে নিযুক্ত শ্রমের অবদান পরিমাপ করতে গেলে কখনোই শ্রমঘণ্টা উপযুক্ত মাপকাঠি নয়। জ্ঞানকেন্দ্রিক শ্রম ক্রমাগত কাজের সময় ও কাজের বাইরের সময়ের প্রাচীরকে ভেঙে দিচ্ছে। কোনও ডিজাইনার বা সফটওয়্যা র ইঞ্জিনিয়ার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে নিযুক্ত শ্রমিক সে যতক্ষণ অফিসে আছে ততক্ষণই শুধু তার মেধা কাজ করছে এরকম নয়। এই কাজে সে মনোনিবেশ করছে কাজের সময়ের বাইরেও। ভাবনা চিন্তার আধিপত্য শ্রমের প্রয়োগে যত বাড়বে কাজের ঘণ্টা দিয়ে শ্রমের অবদানকে পরিমাপ করা তত কঠিন হয়ে পড়বে। সবচাইতে বড় ব্যাপার হলো জ্ঞানকেন্দ্রিক বিকাশ আসলে উৎপাদনের বিপুল সামাজিকীকরণের উপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেটের ব্যবহার করে যখন কেউ এই বিপুল তথ্য ভাণ্ডারকে কাজে লাগাচ্ছে অথবা চ্যাট জিপিটি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল ব্যবহার করছে তখন আসলে আমরা প্রত্যেকে মানব সভ্যতার সম্মিলিত জ্ঞান ভাণ্ডারকে ব্যবহার করছি এবং তার উপরে উৎপাদনের নির্ভরশীলতা প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। এই প্রবণতাটি জ্ঞানের স্বাভাবিক প্রবণতা যা অন্যান্য কোনও উৎপাদনের উপকরণ থেকে জ্ঞানকে আলাদা করে দেয়। অন্য সমস্ত উপকরণ অন্যের সঙ্গে বিনিময় করলে কমে যায়। অর্থাৎ কয়লা, লোহা বা প্লাস্টিক বা কাগজ যাই হোক না কেন তা ব্যবহার করার মধ্যে দিয়ে কমে আসে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। জ্ঞান যত অন্য অংশের মানুষের সঙ্গে বিনিময় বা আলোচনা করা যায় তত প্রত্যেকেরই জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। আজকের পৃথিবীতে সমস্ত প্রযুক্তি অনেক বেশি ফিডব্যাক নির্ভর, অনেক বেশি যৌথ দক্ষতা নির্ভর,অনেক বেশি কল্যাবরেটিভ। এইরকম একটি উৎপাদন ব্যবস্থা যা প্রতিদিন মানুষের সৃষ্ট তথ্য ভাণ্ডার ও জ্ঞানের বিনিময়ের উপর নির্ভরশীলতা কখনোই ব্যক্তিগত মালিকানার উপরে গড়ে ওঠা পুঁজিবাদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না। বিশ্বব্যাপী তথ্যের আদান-প্রদান যা মানুষ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত করে চলেছে তাই আজকের প্রযুক্তির কাঁচামাল সৃষ্টি করছে। এই তথ্য তৈরি করছি আমরা বিনা পয়সায়। আর এই বিপুল তথ্যই মানুষের পছন্দের প্রকৃতি নির্ধারণে বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থাগুলি ব্যবহার করছে। আজকের পৃথিবীতে প্রতিমুহূর্তে সৃষ্ট এই বিপুল তথ্য ভাণ্ডারের উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত পুঁজিবাদ। অতীতের সমস্ত কাঁচামাল ছিল পৃথিবীর নির্দিষ্ট ভূগোলে সীমিত। তেল, লোহা, কয়লা ইত্যাদির উপরে কর্তৃত্ব স্থাপন করতে গেলে কোনও দেশ বা অঞ্চলের উপরে আধিপত্য স্থাপন করাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ভুবন প্রবাহিত তথ্যের উপরে কর্তৃত্ব স্থাপন করতে হলে পৃথিবীব্যাপী একচেটিয়া অধিকার স্থাপন করতে হয়। গুগল, আমাজন, আলিবাবা, ফেসবুক, টেনসেন্ট এরকম গুটিকয়েক সংস্থা পৃথিবীর তথ্য ও জ্ঞানভাণ্ডারের উপরে একাধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা করে চলেছে।জ্ঞানকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা এ কারণেই পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চলেছে। একদিকে যেমন জ্ঞানকেন্দ্রিক উৎপাদন মানুষের সঙ্গে মানুষের চিন্তারমুক্ত আদান-প্রদানের উপরে নির্ভর করে। তাই ব্যক্তিমালিকানাধীন তথ্য ও জ্ঞানের ব্যবস্থা আসলে জ্ঞানকেন্দ্রিক উৎপাদনের অগ্রগতিকে সীমিত করে রাখবে। মার্কস একটি বিকল্প সমাজের চিন্তা করেছিলেন স্বর্গ নির্মাণের লক্ষ্যে নয়— এই চিন্তার উৎস হলো প্রচলিত ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সংঘাত যা পুঁজিবাদ তার নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে নিরসনে ব্যর্থ। দ্বিতীয়ত, একথা ঠিক বর্তমান প্রযুক্তির প্রবাহ সমাজে কি প্রভাব ফেলতে চলেছে এখনই হাত গুনে বলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একথা ঠিক যে কারখানা শিল্পে রোবটের ব্যবহার এবং সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষত পরিষেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ব্যাপকভাবে সরাসরি শ্রমের চাহিদা কমিয়ে আনবে। কিন্তু এর জন্য ব্যাপক কর্মহীনতা তৈরি হওয়ার যে নানা ইঙ্গিত গবেষণায় উঠে আসছে তার জন্য দায়ী প্রযুক্তি নয় তার জন্য দায়ী পুঁজিবাদ। যে কাজটা আগে দশ ঘণ্টায় হতো তা যদি প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে তিন ঘণ্টায় হয় তাহলে কর্মরত শ্রমিক কম ঘণ্টা কাজ করতে পারে কিন্তু তাকে বেকার হতে হবে এর কোনও মানে নেই। অর্থাৎ ধরা যাক ২০২৬ সালে ভারতবর্ষের মানুষের যা যা প্রয়োজনীয়তা তা বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকরা দিনে আট ঘণ্টা করে সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করে উৎপাদন করে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে ওই একই কাজ দিনে আট ঘণ্টা করে সপ্তাহে চার দিনে সম্পন্ন হতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাদ এই রাস্তায় হাঁটে না এর কারণ প্রযুক্তির মালিকানা ব্যক্তি পুঁজির এবং সে শ্রমিকের থেকে যতটা সম্ভব উদ্বৃত্ত মূল্য সংগ্রহ করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট। এ কারণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে পুঁজিবাদী সমাজে কাজের সময় কমে আসেনি বরং দ্বিমেরু সমাধান পুঁজিবাদ খুজেছে। যারা কাজ করবে তারা প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এবং পরে একই সময় অথবা বর্ধিত সময় কাজ করবে— আর বাকি একটা বড় অংশ সম্পূর্ণভাবে কাজ হারাবে। কিন্তু এই প্রযুক্তির উপরে যদি সামাজিক মালিকানা থাকে অথবা বিপুল তথ্য ভাণ্ডার যা প্রতিনিয়ত মানুষ তৈরি করছে তার উপরে সামাজিক কর্তৃত্ব থাকে তাহলে প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবন-জীবিকার মানের উন্নয়ন ঘটাবে শুধু তাই নয় মানুষের নিজস্ব ব্যবহারের ‘মুক্তসময়’(free time) তত বৃদ্ধি পাবে। মার্কস বলেছিলেন যে আগামী দিনে সম্পদ সৃষ্টির পরিমাপ মানুষ কত ঘণ্টা কাজ করছে তা দিয়ে মাপার দিন শেষ হয়ে আসছে বরং মানুষ কত ঘণ্টা মুক্ত সময় পাচ্ছে সেটাই সভ্যতার বিকাশের মাপকাঠি হবে।আজকের পৃথিবীর নতুন প্রযুক্তি সমাজবাদের বাস্তবতাকে অনেক কাছাকাছি নিয়ে আসছে। উৎপাদনের সামাজিকীকরণ বণ্টনের সামাজিকীকরণকেও অনিবার্য করে তুলছে। শুধু তাই নয় ইন্টারনেট ব্যবহারে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের চাহিদা ও সেই অনুযায়ী বণ্টনের সামঞ্জস্য রিয়েল টাইমে স্থাপন করা অনেক বেশি সহজ হয়ে গিয়েছে। বাজারের স্বতঃস্ফূর্ততার উপর নির্ভর না করে বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সমাজে যথাযথ ভাবে রসদ বণ্টনের বাস্তবতা তৈরি করছে। মানুষ শুধুমাত্র সমবেতভাবে উৎপাদন করবে তাই নয়। কোন ধরনের উৎপাদন হবে, কিভাবে তা বণ্টিত হবে এবং কিভাবে অতিরিক্ত রসদ নতুন সম্পদ সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হবে এসব কিছু মানুষ ঠিক করবে সরাসরি আদান-প্রদানের মাধ্যমে। একাজে আজকের প্রযুক্তি বস্তুগত সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু প্রযুক্তি সমাজ বদলায় না। তা নতুন সমাজের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে মাত্র। একে বদলানোর জন্য যা দরকার তা হলো সম্পত্তির মালিকানার আমূল পরিবর্তন যা রসদ,প্রযুক্তি, উৎপাদনও বণ্টনের উপরে সামাজিক মালিকানা স্থাপন করবে।
প্রযুক্তি ও মানব অগ্রগতিঃ একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র
Ganashakti Patrika•

Full News
Share:
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Achira News.
Publisher: Ganashakti Patrika
Want to join the conversation?
Download our mobile app to comment, share your thoughts, and interact with other readers.