Achira News Logo
Achira News

ভারতীয় বিধানসভা নির্বাচনঃ ডানপন্থী শক্তিগুলির সাফল্যে মিশ্র ফলাফল

Ganashakti Patrika
ভারতীয় বিধানসভা নির্বাচনঃ ডানপন্থী শক্তিগুলির সাফল্যে মিশ্র ফলাফল
Full News
Share:

কেমন হলো চার রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ফলাফল? নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়, একদিকে দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তির আগ্রাসন আরও ভয়ঙ্করভাবে যেমন থাবা বসাচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে শাসকবিরোধী মনোভাবও নানা ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তামিলনাডুতে ডিএমকে’র পরাজয়ে আরেক আঞ্চলিক দল টিভিকে’র উত্থানই সেকথা প্রমাণ করে। তবে ব্যতিক্রম সেখানে কেরালা। ওই রাজ্যে ১০ বছর পর পালাবদল হলেও এলডিএফ’র জায়গায় ক্ষমতায় এসেছে সেই ইউডিএফ। সাম্প্রদায়িক বিজেপি যদিও দাঁত ফোটাতে পারেনি ওই দু’রাজ্যে। আসামে বিজেপি তার ক্ষমতা ধরে রাখলো উগ্র হিন্দুত্বের প্রচার চালিয়েই। তবে তাৎপর্যপূর্ণ ফল অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের ফল। ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটে কুর্সিতে বসতে চলেছে বিজেপি। তবে জয় যতটা না কৃতিত্ব বিজেপি’র, তার থেকেও তৃণমূল কংগ্রেসের অপশাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধেই জনাদেশ বলে মত বিশেষজ্ঞদের।আরেক একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, এবারের বিধানসভা ভোট হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা এবং তামিলনাডুর ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পর। ওই তিন রাজ্যেই বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যায় এসআইআর’র ফলে। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লক্ষ বৈধ ভোটার ভোট দিতে পারেননি এবারের নিবার্চনে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেন্সি’র খাড়া ঝুলে থাকায়। সুপ্রিম কোর্টের রায় সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন সেই বৈধ ভোটারদের ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারেনি। পুরো বিষয়টি বিচারপতিদের উপর ন্যস্ত হওয়ায় স্বল্প সময়ে সেই ভোটারদের ‘লজিক্যাল ডিসক্রেন্সি’র গেঁরো থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতি অবশ্য কেরালা কিংবা তামিলনাডুর ক্ষেত্রে হয়নি।কেরালায় ইউডিএফ ১৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ ৮৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। এলডিএফ পেয়েছে ৩৫টি আসন। গত ভোটে একটি আসন না পেলেও এবার তিনটে আসন জিততে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। তবে কেরালার ক্ষেত্রে এলডিএফ সরকারের পরাজয়কে সরলীকৃতভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। টানা দশ বছরের শাসনে এলডিএফ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণবণ্টন ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা পেনশন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের মধ্যে একমাত্র রাজ্য কেরালা যেখানে সরকারের প্রচেষ্টায় সম্পর্ণভাবে দারিদ্র দূরীকরণ সম্ভব হয়েছে। কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেরালার মডেল আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়। এরই পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের ধারাবাহিক আর্থিক বঞ্চনা, জিএসটি ক্ষতিপূরণে অনিয়ম, ঋণগ্রহণে বাধা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনুদান কমিয়ে দেওয়া—রাজ্যের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে চাপ সৃষ্টি করে। অবশ্য এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় স্তরে কিছু প্রশাসনিক অসন্তোষ, বিরোধীদের অপপ্রচার এবং বিশেষ করে কেরালার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের স্বাভাবিক মানসিকতা। ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন ঘটেছে।তামিলনাডুতে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটের ধাক্কা এবং অভিনেতা বিজয়ের দু’বছর আগে তৈরি করা দল টিভিকে’র উত্থান আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনশীল চরিত্রকেই সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে এবং এডিএমকে’র মতো দুই প্রধান শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান জনমানসে বিকল্পের অনুসন্ধানকে প্রকাশ করে। চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক শক্তি মূলত যুবসমাজের একাংশকে আকৃষ্ট করেছে, যা ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে সরকার গড়ার মতো শক্তি অর্জন করতে পারেনি টিভিকে। একক গরিষ্ঠতা পেলেও তাদের অন্য কোনও শক্তির উপর নির্ভর করতে হবে সরকার গঠন করতে হলে। এবারের ভোটে ২৩৪ আসনের মধ্যে টিভিকে ১০৭, ডিএমকে ৭৪ এবং এডিএমকে ৫২টি আসন পেয়েছে।আসামে বিজেপি’র পুনরায় জয়লাভ পুরোপুরি ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি, নাগরিকত্ব প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক আবেগকে ব্যবহার করার ফল। রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ থাকলেও বিদ্বেষ আর ধর্মীয় উসকানি দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হলেন হিমন্তবিশ্ব। আসামে বিজেপি ১০২টি এবং কংগ্রেস ২১টি আসন পেয়েছে। গতবারের থেকেও শক্তি বাড়িয়েছে বিজেপি। একইভাবে পুদুচেরিতে এনআর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বজায় রেখে ক্ষমতা ধরে রাখল বিজেপি।পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বেকারত্ব, গ্রামীণ অর্থনীতির স্থবিরতা এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারের অভিযোগে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি বিপুল অর্থব্যয়, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং লাগাতার প্রচারযুদ্ধ চালায়। নির্বাচন কমিশন সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। বিজেপি ২০০-র বেশি আসন পাওয়ার নেপথ্যে তৃণমূল সরকার বিরোধী তীব্র অসন্তোষই কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবুও লক্ষণীয়, এই তীব্র মেরুকরণের মাঝেও বামপন্থী শক্তির ভোট ও সংগঠনে কিছু পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।এই সমস্ত ফলাফল একত্রে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে দেশে একদিকে ডানপন্থী শক্তির প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী শক্তিগুলির মধ্যে ঐক্যের অভাব এবং বিকল্প রাজনৈতিক বয়ানের দুর্বলতা তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের পক্ষে অশনি সঙ্কেত।

Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Achira News.
Publisher: Ganashakti Patrika

Want to join the conversation?

Download our mobile app to comment, share your thoughts, and interact with other readers.

ভারতীয় বিধানসভা নির্বাচনঃ ডানপন্থী শক্তিগুলির সাফল্যে মিশ্র ফলাফল | Achira News