দ্য ইন্টারসেকশন অফ ইমাজিনেশন অ্যান্ড সায়েন্সঃ দ্য ইমার্জেন্স অফ সায়েন্স ফিকশন
প্রাচীনকাল থেকেই বারবার মানুষের মনে উঁকি দিয়ে গেছে ভবিষ্যতের আশা, আশঙ্কা, দুশ্চিন্তা, দুরাশা। কেমন হবে আগামীদিন? ‘শেষের সেদিন’ কি সত্যিই ভয়ংকর? নাকি প্রযুক্তির উন্নতির জোয়ারে সওয়ার হয়ে ক্রমশ সহজ থেকে সহজতর হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা? এই সব প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে মানুষ বারবার কল্পনা করতে চেষ্টা করেছে সভ্যতার ভবিষ্যৎকে। আর ঠিক এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে কালজয়ী সব সাহিত্যকীর্তি। দুই মলাটের মাঝে জায়গা করে নিয়েছে আলাদা এক সাহিত্য–ঘরানা, যার নাম কল্পবিজ্ঞান। ‘কল্পবিজ্ঞান’–এর আড়ালে হাতছানি রয়েছে দুটি শব্দের। কল্পনা এবং বিজ্ঞান। অর্থাৎ, শুরুতেই দুই শব্দের বাঁধনে সংজ্ঞায়িত করে নেওয়া যায় এই সাহিত্য-ঘরানাকে। প্রথমত, এই ধরনের লেখা মূলত কল্পনাপ্রসূত। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যৎ কল্পনার গোড়ার কথায় ধরেই নেওয়া হচ্ছে, আগামীদিনে যে সব ক্ষেত্রে মানুষ প্রভূত উন্নতি করবে তার মধ্যে একটি অবশ্যই বিজ্ঞান। তবে পরবর্তীকালে অনেক সাহিত্যিকই কল্পনা এবং বিজ্ঞানের বাঁধন ভেঙে বেরিয়ে নতুন রসে, নতুন আঙ্গিকে রূপ দিয়েছেন কল্পবিজ্ঞান চর্চাকে। কে প্রথম লিখেছিলেন কল্পবিজ্ঞান কাহিনী? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারা বেশ কঠিন। কারণ, ওই যে বললাম, সভ্যতার মূল পরিচায়ক লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর থেকেই মানুষের মনে আগামীকে জানার কৌতূহল জেগেছে। সেই বিচারে স্পেনের আলতামিরা গুহা হোক বা মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা, আদিম মানুষের আঁকা গুহাচিত্রের আড়ালে সেই জিজ্ঞাসা যে ফুটে ওঠেনি, তা কে বলতে পারে? তবে ‘সবজান্তা’ উইকিপিডিয়ার কাছে এই প্রশ্নের একটা উত্তর আছে বটে। বিশ্বকোষ বলছে, বিশ্বের সর্বপ্রথম কল্পবিজ্ঞান কাহিনী বা বলা ভালো, পৌরাণিক কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর নাম হল ‘দ্য এপিক অফ গিলগামেশ’, যার রচনাকাল আনুমানিক ২১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। প্রাচীন মেসোপটেমীয়দের পুরাণের এক দুর্দমনীয় নায়ক গিলগামেশ। কাহিনীর দ্বিতীয়াংশে দেখা যায়, প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে দিশেহারা নায়ক পাড়ি দিচ্ছেন ভবিষ্যতে। মৃত্যুহীন, জ্বরাহীন, ব্যাধিহীন অখণ্ড যৌবনের রহস্য উদ্ঘাটনের আশা নিয়ে। এখান থেকে ধারণা করা যায়, আজ থেকে প্রায় চার সহস্রাব্দ আগেও মানুষের মনে ‘টাইম মেশিন’–এ চড়ে ভবিষ্যৎ থেকে ঘুরে আসার অভিলাষ ছিল। আশা ছিল, ভবিষ্যতের মানুষ হবে অনেক বেশি জ্ঞানী, বুদ্ধিমান এবং প্রযুক্তিতে তুখোড়। এতটাই ধুরন্ধর হবে তারা যে জীবন্মৃত্যুর গোলকধাঁধাও ভেদ করে ফেলবে! তবে আদিমকালের কল্পবিজ্ঞানের কথা এখানেই শেষ নয়। প্রাচীনকালে বারবার লেখা হয়েছে ভবিষ্যতের কাহিনী। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে রোমান রচয়িতা লুসিয়ান লিখেছেন ‘আ ট্রু হিস্ট্রি’। এই গল্পে মানুষের মহাকাশযাত্রা, ভিনগ্রহী জীবদের ধারণা মেলে। গ্রিক ভাষায় লেখা এই গল্প সম্পর্কে অনেক পণ্ডিতের অভিমত, কালের আগে কল্পনা করেছিলেন লেখক লুসিয়ান অফ সামোসাটা। প্রাচীন জাপানি লোকসাহিত্যও এমন অনেক কল্পবিজ্ঞানধর্মী লেখার উদাহরণ দেয়। যেমন, উরাশিমা তারো, নহংগি, দ্য টেল অফ দ্য বাম্বু কাটার। এই সব গল্পে হাজার বছর পরের কথা ছাড়াও আছে, উড়ন্ত পিরিচ, গ্রহান্তরের যাত্রা, ভিনগ্রহী জীবের সচিত্র বর্ণনা। এই তালিকায় আছে আরব্য রজনীর নামও। চিরযৌবন দায়ী বনৌষধি, কথাবলা গাছ, মহাকাশের সরীসৃপ- এহেন অনেক উপাদানের মধ্যে দিয়ে ভেসে আসে কল্পবিজ্ঞানের দ্যোতনা। প্রাচীনযুগের বিজ্ঞান ও পৌরাণিক কল্পবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা করতে হলে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় সুইস লেখক এরিক ভন দানিকেনের নাম। লিখেছেন অসংখ্য বই। ‘দেবতা কি গ্রহান্তরের মানুষ?’, ‘দেবতারা কি মর্ত্যে এসেছিলেন?’, ‘প্রচলিত ইতিহাস কি অসম্পূর্ণ?’, ‘বীজ ও মহাবিশ্ব’-র মতো সংকলনে তিনি বিভিন্ন সভ্যতার পুরাণ–মহাকাব্য–প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বিশদ কাটাছেঁড়া করেছেন। তাঁর গবেষণা, তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে তিনি বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, যুগ যুগ আগের মানুষ আমাদের ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিয়ে গিয়েছেন কি? ইলিয়াড, ওডিসি, রামায়ণ, মহাভারতে বর্ণিত বিভিন্ন যন্ত্র, যান, প্রযুক্তি, সমরাস্ত্র, রণকৌশল ছিল তৎকালীন সময়ের তুলনায় অনেক অনেক আধুনিক। তবে ইউরোপে নবজাগরণ এবং শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে জোয়ার আসে বিজ্ঞানচর্চায়। এই সময় গ্যালিলিও, কোপারনিকাস, দ্য ভিঞ্চি, গুটেনবার্গের মতো কৃতীরা যে গবেষণা করে গিয়েছেন, সেই সব তত্ত্ব, সেই সব নকশা কল্পবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ কীর্তির চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা নকশা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি হেলিকপ্টার, উড়োজাহাজ, ডুবোজাহাজের মতো অত্যাধুনিক জটিল প্রযুক্তির কল্পনা করেছিলেন। গ্যালিলিও বা কোপারনিকাসরা সেই যুগে দাঁড়িয়ে, কার্যত কোনও আধুনিক যন্ত্র ছাড়া ভেদ করেছিলেন মহাকাশের জটিল রহস্য। বিজ্ঞানী জোহান্স কেপলারের লেখা ‘সমনিয়াম’ (১৬৩৪) বা ফ্রান্সিস গডউইনের লেখা ‘দ্য ম্যান ইন দ্য মুন’ (১৬৩৮) চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের সফল পদার্পণের গল্প বলে। এঁদের সমসাময়িক পেশাদার সাহিত্যিকরাও লিখে গিয়েছেন কল্পবিজ্ঞান কাহিনী। যেমন উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘দ্য টেমপেস্ট’ (১৬১০–১১), ফ্রান্সিস বেকনের ‘দ্য আটলান্টিস’ (১৬২৭), জনাথন সুইফটের ‘গ্যালিভার্স ট্রাভেল’ (১৭২৬) ইত্যাদি অগ্রগণ্য। এরপর সাহিত্য–ঘরানা হিসেবে কল্পবিজ্ঞানকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। রেনেসাঁর যুগের মনীষীদের হাতে স্থাপিত ভিত্তিপ্রস্তরের ওপরে দাঁড়িয়ে ইমারত গড়ে তোলেন আধুনিক লেখকরা। নিঃসন্দেহে বলা চলে, এটাই ছিল কল্পবিজ্ঞানধর্মী সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। একের পর এক এসেছেন প্রথিতযশা কল্পবিজ্ঞান লেখকরা। এই সময় জুল ভার্ন লেখেন ‘টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’, ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ’–এর মতো লেখা। তাঁর সঙ্গে যোগ্য সংগত দেয় এইচজি ওয়েলসের লেখা ‘দ্য টাইম মেশিন’, ‘দ্য ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। মেরি শেলির লেখা ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন : অর দ্য মডার্ন প্রমিথিয়াস’ লেখার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন একাধারে কল্পবিজ্ঞান, একই সঙ্গে শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত খেলিয়ে দেওয়া ভয়ের গল্প। এরপর কল্পবিজ্ঞানধর্মী গল্পের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলতে থাকে হাস্যকৌতুক থেকে শুরু করে পলিটিকাল স্যাটায়ার, সবই। একে একে আসতে থাকেন ভিক্টর হুগো, এডগার অ্যালেন–পো, জেন সি. লাউডন, এডওয়ার্ড এস. এলিস, স্যামুয়েল বাটলার, রাডয়ার্ড কিপলিং, মার্ক টোয়েন, জর্জ বার্নার্ড–শ, জ্যাক লন্ডন, আইজ্যাক অ্যাসিমভ, আর্থার সি ক্লার্ক, ফিলিপ কে ডিক, এইচ পি লাভক্র্যাফ্ট। এক্ষেত্রে মনে করিয়ে দিতেই হয় শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যর আর্থার কোনান ডয়েলের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কথা।