বলিউড সেলিব্রিটি থেকে বিজয়-রশ্মিকার বিয়েঃ হেয়ারড্রেসার হিসাবে সৌরভ রায়ের যাত্রা
কলকাতায় নয়, অসমেই জন্ম ও বড় হওয়া। বাঙালি পরিবারের ছেলে।কাজ করার পরিকল্পনা ছিল টলিউডে, কিন্তু পৌঁছে যান বলিউডে। তব্বু থেকে জাহ্নবীকপূর, শিল্পা শেট্টী থেকে মলাইকা অরোরা— কাকে না সাজিয়েছেন তিনি! গত তিন বছর ধরেনিজের কেশসজ্জার জন্য সৌরভকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করেন না রশ্মিকা মন্দানা।গায়ে হলুদ, মেহন্দি বা বিয়েতে তাই বাঙালি কেশসজ্জাশিল্পীর ছোঁয়া এতটাই স্পষ্ট।আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি হয়ে নিজের যাত্রা থেকে বিজয়-রশ্মিকার বিয়েরখুঁটিনাটি, সব প্রকাশ করলেন ২৬ বছরের সৌরভ রায়। প্রশ্ন: এখন রশ্মিকার চুলের গোটাদায়িত্ব আপনারই কাঁধে? চারদিকে আপনাকে নিয়ে কত আলোচনা! সৌরভ:সকলের এতভালবাসা পেয়ে সত্যিই আপ্লুত আমি। ‘টিম ব্রাইড’ (কনের দল)-এর সকলেরই কৃতিত্ব আছে এতে। সবচেয়ে বড়কৃতিত্ব রাশুর (রশ্মিকাকে তিনি যে নামে ডাকেন)। ওঁ আসলে বড় সুন্দর মনের মানুষ, সেটার ছাপ ওঁর মুখেই পড়ে। তাই সব অনুষ্ঠানেএত অপূর্ব দেখাচ্ছিল রশ্মিকাকে। প্রশ্ন: আর বিজয় কেমন? সৌরভ:বিজয়েরসঙ্গে কাজ করিনি। রশ্মিকার সঙ্গেই থাকতাম ওই দিনগুলোয়। কিন্তু বিজয়ও দুর্দান্ত এক মানুষ। তাঁর সাজও প্রচুর প্রশংসা পেয়েছে। তারউপরে ওঁদের প্রেমটা ভীষণ মিষ্টি। বিয়ে ও গায়ে হলুদে রশ্মিকার কেশসজ্জা। ছবি: সংগৃহীত প্রশ্ন: উদয়পুরে রশ্মিকা-বিজয়েরবিয়ের ৫ দিনে বিশেষ নিয়মকানুন মানতে হয়েছিল? সৌরভ:সব তারকা-বিয়েতেই এখনঅল্পস্বল্প নিয়ম মেনে চলতে হয়। ফোন লক করা, ক্যামেরা ঢেকে রাখা ইত্যাদি। সকলেরজন্যই এক নিয়ম। এগুলো দরকারি বলেই মনে হয় আমার। আমাদেরও যা ছবি, ভিডিয়ো উঠেছে, তাপেশাদার চিত্রগ্রাহকরাই তুলেছেন। প্রশ্ন: খাবারদাবার কেমন ছিল? সৌরভ:কত রকমের খাবার,তা গুনে শেষ করা যাবে না। (হেসে) অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণই ছিল খাবার। দক্ষিণ থেকেউত্তর, সব জায়গার রান্না ছিল। প্রশ্ন: বিজয়-রশ্মিকাও ডায়েট ভেঙেখাওয়াদাওয়া করছিলেন? সৌরভ:তাঁদেরজীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। (হেসে) ডায়েটের কথা কে মাথায় রাখে? তবেতার মধ্যেও স্বাস্থ্যের কথা খেয়াল রাখতে হচ্ছিল বটে। ৫ দিনের একটানা পর পর অনুষ্ঠান যে। অত ধকল নেওয়ার জন্য কিছু তো নিয়মমানতেই হবে। তাই কিছু মিষ্টি পদ ছিল চিনি ও গ্লুটেনহীন। আসলে রশ্মিকা মিষ্টি খেতে খুব ভালবাসেন। তিনি ওগুলোই খাচ্ছিলেন। বিজয়ওখুব স্বাস্থ্যসচেতন। তাঁদের পরিবারের লোকজনও তেমন। রিসেপশন ও মেহন্দিতে রশ্মিকার কেশসজ্জা। ছবি: ইনস্টাগ্রাম প্রশ্ন: তাঁরা যে সম্পর্কেজড়িয়েছেন, সে খবর নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে আগেই ছিল? সৌরভ:(হেসে) হ্যাঁ! ওঁরা আসলে বাইরের জগৎকে সব কথা আগে থেকে বলতে চাননি। কিন্তু আমরাতো জানতামই যে, বিয়েটা হবে। আজ, নয়তো কাল। ওঁদের প্রেম কি আর আজকের কথা? ৭ বছরের তুমুল প্রেম। এত দিনের সম্পর্ক, তাও ওঁদের এখন দেখলে মনে হবে, যেননতুন জুটি। বিয়ের দিন রশ্মিকাকে দেখলে বুঝতে পারতেন, কতটা খুশি ছিলেন তিনি। প্রশ্ন: সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তকোনটি ছিল বিজয়-রশ্মিকার? সৌরভ:ওঁদের বাগ্দানেরদিনটা ঐশ্বরিক ছিল। যখন বিজয় ওঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন হাঁটু মুড়ে…রশ্মিকাও হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন। চোখে হালকা জলও আসে দু’জনের।ওই মুহূর্তটা ভীষণ সুন্দর ছিল। প্রশ্ন: আর বিয়ের প্রস্তুতি? সৌরভ:বিয়ের ৬-৭ মাসআগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চুপিচুপি। রশ্মিকা নিজের সাজ নিজেইঠিক করেছিলেন। আর এত বছর ধরে রশ্মিকার সঙ্গে কাজ করে ওঁর পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কেধারণা আমার ছিলই। তাই আলাদা করে খুব খাটতে হয়নি। অন্যান্য তারকা-বিয়ের মতো কোনও ‘স্টেটমেন্টলুক’ এখানে করা হয়নি। একেবারেই ওঁর পছন্দের কথা ভেবে সাজগোজঠিক করা হয়েছিল। প্রশ্ন: কোন দিন কী রকম সাজবেনবলেছিলেন রশ্মিকা? সৌরভ:বিয়ের সাজেরশ্মিকা শুরু থেকেই ‘লং মারমেড হেয়ার’চেয়েছিলেন। মানে পিছন থেকে চুলটা পুরো মৎস্যকন্যার মতো দেখতে লাগবে। গায়ে হলুদেরদিন টানটান থাকবে চুল, পিছনে ঝুঁটি। মেহন্দির জন্য চুল একটু হালকা বাঁধতেচেয়েছিলেন। একটু মজাদার কিছু দরকার ছিল। রিসেপশন নিয়ে আমরা একটু ধন্দে ছিলাম।বিনুনি থাকবে, না কি খোঁপা। কারণ, আগের কোনও অনুষ্ঠানে আমরা খোঁপা করিনি। শেষমেশআমরা বিনুনিই করি ওঁর চুলে। রশ্মিকার কেশসজ্জার দায়িত্ব সৌরভের কাঁধেই। ছবি: ইনস্টাগ্রাম প্রশ্ন: সব সাজ কি তবে পরিকল্পনামতোই হল? সৌরভ:তা কি আর হয়!গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান অনেকটা হোলির মতো আয়োজন করা হয়েছিল। হলুদের হোলি। দু’টিকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সবাই যাতে আনন্দ করতে পারেন। কিন্তু সেটা আমরা আগে থেকে জানতাম না। ফলেসেখানেই বিপাকে পড়তে হয়। জলের সঙ্গে রং মেশানো ছিল। রশ্মিকাও প্রচণ্ড রংখেলেছিলেন। সেই সময়েই ওঁর চুলে লাল রং ধরে যায়। আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। তার পরযখন মেহন্দির জন্য সাজানো হচ্ছিল, তখন দেখা যায়, রশ্মিকার চুলে লাল রং ধরে গিয়েছে!প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ, আমার কাছে যা যা পরচুলা ছিল, চুলেরপিছনে আটকানোর জন্য, তার সঙ্গে রং মিলত না। এ দিকে, পুরো বিয়ের অনুষ্ঠান তখন বাকি। প্রশ্ন: তাই জন্যই কি রশ্মিকারচুলে লাল আভা দেখা যায় বিমানবন্দরের সাজেও? সৌরভ:(হেসে) হ্যাঁ।ওটা সহজে তোলা যায়নি। প্রশ্ন: মেহন্দি আর বিয়েরঅনুষ্ঠান কী ভাবে সামলালেন? সৌরভ:আমি খুবই চিন্তায়পড়ে গিয়েছিলাম। রশ্মিকা ভেবেছিলেন, স্নানের পর উঠে যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। আমিওঁকে বললাম, ‘‘রাশু, তোমার চুল একেবারে ল’রিয়ালেরবিজ্ঞাপনের মতো দেখাচ্ছে। পুরো বারগেন্ডি লাল হয়ে গিয়েছে।’’রশ্মিকা খানিক ক্ষণের মধ্যেই শান্ত হয়ে যায়। আমরাও ধীরে ধীরে পরচুলার সঙ্গে ওঁরচুলের রং মিলিয়ে মিলিয়ে বিষয়টিকে সামলে নিই। বুঝতেই পারবেন না, চুলের কোন অংশ ওঁরনিজের, কোন অংশ নয়। প্রশ্ন: বলিউডের আর পাঁচটা বিয়েরসাজ থেকে কী ভাবে আলাদা বিজয়-রশ্মিকার সাজ? সৌরভ:সাজের থেকেওঅন্য একটা বিষয় কাজ করেছে এখানে। দু’জন যে সাজই বেছে নিন নাকেন, তা ছিল অন্য রকম। কারণ, ওঁরা নিজেদের ব্যক্তিত্ব এবংঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কোনটা ট্রেন্ডিং বা লোকে কোনটা নিয়ে বেশি আলোচনাকরবেন, এ সব ভেবে এগোননি। প্রশ্ন: রশ্মিকা আর বিজয় কিতাঁদের সাজে সীতা আর রামের ছাপ রাখতে চেয়েছিলেন? অনেকেইকিন্তু মিল পেয়েছেন। সৌরভ:আমি ঠিকজানি না ওঁদের উদ্দেশ্য সেটা ছিল কি না। কারণ, আমাদের কিছু বলেননি লুক সেট হওয়ারসময়ে বা সাজার সময়ে। তবে এটা ঠিক, রশ্মিকা নিজের সাজে দেবীর ছাপ রাখতে চেয়েছিলেন।আসলে সেটা ওঁর কোডাভা সংস্কৃতির সাজের সঙ্গেই চলে আসে। সেটাকেই অনেকে সীতার সঙ্গেতুলনা করছেন হয়তো। কেশসজ্জাশিল্পী সৌরভ রায়। ছবি: সংগৃহীত প্রশ্ন: রশ্মিকাকে সাজানোরবিশেষত্ব কোথায়? সৌরভ:ওঁরব্যক্তিত্ব। ওঁর এনার্জিটাই খুব পজ়িটিভ। সবাইকে আনন্দে রাখে, হাসিয়ে রাখে। শান্ত,কখনও বিরক্ত হন না। ওঁর মধ্যে ছোট শহরের একটা ছাপ এখনও রয়ে গিয়েছে। এখনও কুর্গথেকে আসা ওই মিষ্টি, সরল মেয়েটা ওঁর ভিতরে রয়েছে। প্রশ্ন: বলিউডে আর কার সঙ্গে কাজকরতে ভাল লাগে? সৌরভ:প্রথমনাম, রশ্মিকাই হবে। দ্বিতীয়, জাহ্নবী কপূর। প্রশ্ন: কোন অভিনেত্রীর চুলসবচেয়ে ভাল? সৌরভ:(হেসে) প্রথম রশ্মিকা, তার পর জাহ্নবী। দু’জনের মধ্যেইদক্ষিণ ভারতীয় রক্ত রয়েছে। তৃতীয় নাম বলতে হলে, শিল্পা শেট্টী। এই বয়সেও প্রচণ্ডঘন ও সুন্দর চুল। প্রশ্ন: কিন্তু নায়িকাদের নাকিপরচুলা পরাতেই হয়? সৌরভ:সে তো সিনেমায়বিভিন্ন চরিত্রের জন্য পরতেই হয়। যেমন ‘মেট্রো ইন দিনো’-তে সারা আলি খানকে বব কাট করা উইগ পরাতে হয়েছিল। সারার সঙ্গে সৌরভ। ছবি: ইনস্টাগ্রাম প্রশ্ন: কিন্তু এমনি সময়েও তোপরতে হয়? সৌরভ:না, না।সিনেমা ছাড়া তাঁরা পরচুলা পরেন না। প্রশ্ন: বিয়ের জন্য রশ্মিকাকেপরতে হয়েছিল যে? সৌরভ:সেটাও তোপ্রয়োজনে। মৎস্যকন্যার মতো চুল তৈরি করতে হলে যে কারও চুলেই সেটা প্রয়োজন। কেবল ওইদৈর্ঘ্যটা পাওয়ার জন্য পরচুলার দরকার পড়ে। তা-ওঅল্প করে পিছন দিকে। কিন্তু রোজের সাজে একেবারেই নায়িকারা পরচুলা পরেন না। নিজেদেরচুলের সাজই যথেষ্ট। প্রশ্ন: নায়কদের সঙ্গে কাজ করতেচান না? সৌরভ:সত্যি বলতে,পুরুষদের চুলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবকাশ বড়ই কম। লম্বা চুল থাকলেও। চরিত্রেরক্ষেত্রেও ৫-৬টির বেশি স্টাইল করা যায় না। তাই পেশা হিসেবেও সুযোগ কম। তা ছাড়া, আমার মহিলাদের সাজাতেই বেশি ভাললাগে। ছোট থেকেই আমি বাড়ির মেয়েদের সাজাতে ভালবাসতাম। প্রশ্ন: বাড়ির পুরুষ মেয়েদেরসাজাতে ভালবাসে, সমাজ তো সোজা চোখে দেখে না এটা। তা নিয়ে সমস্যা হয়নি বা়ড়িতে? সৌরভ:আমার পরিবারেসত্যিই কোনও দিন এ সব নিয়ে কেউ ভাবতেন না। তবে এ-ও ঠিক, কেউ ভাবেননি যে আমি এটাকেইপেশা করে নেব। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার বা শিক্ষক অথবা ও রকম কিছুই করব বলে ধরেনিয়েছিলেন সকলে। প্রশ্ন: প্রথম দিকে নিশ্চয়ই খুবইকঠিন ছিল মুম্বইয়ের জীবন? সৌরভ:খানিকটা ছিল বটে। কিন্তুআমি ওখানে গিয়েই একটা কোর্স করেছিলাম। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচুর সাহায্যপেয়েছিলাম। ওরাই প্রথম দিকে সহকারী হিসেবে কাজের সন্ধান দিয়েছিল। প্রথম কাজইপেয়েছিলাম পোশাকশিল্পী সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় ও মণীশ মলহোত্রর ফ্যাশন শো-তে। প্রশ্ন: বলিউডে পা পড়ল কী ভাবে? সৌরভ:একাধিকরূপটানশিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ করি, যাঁরা বলিউডে কাজ করেন। সে ভাবেই এক জনখ্যাতনামী শিল্পীর সহকারী হিসেবে সুযোগ পাই সিনেমায় সাজানোর জন্য। ৬ মাস পর ধীরেধীরে একা কাজ করার পথে এগোই। প্রশ্ন: প্রথম কোন তারকার মূলকেশসজ্জাশিল্পী হিসেবে কাজ করেন? সৌরভ:সহকারী হিসেবে তব্বুম্যাম, মলাইকা অরোরাদের সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু তারা সুতারিয়ার সঙ্গে প্রথম কাজশুরু আমার। তব্বু এবং তারা সুতারিয়াকে সাজাতে ব্যস্ত সৌরভ। ছবি: ইনস্টাগ্রাম। প্রশ্ন: কলকাতায় কাজ করার ইচ্ছেআছে? সৌরভ:খুব আছে!কিন্তু কোনও সুযোগ আসেনি এখনও। প্রশ্ন: কোন কোন নায়িকাকে সাজাতেচান? সৌরভ:কোয়েলমল্লিক! ছোটবেলায় ওঁর ছবির গান খুব দেখতাম। শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়ও খুব সুন্দরী।তাঁর কেশসজ্জা করারও ইচ্ছে আছে। প্রশ্ন: তা হলে তো কলকাতায় আসতেইহবে! সৌরভ:আমি তো যাই। যদিও খুব বেশি না। কাজের জন্য মলাইকা এবংসারার সঙ্গে বহু বার গিয়েছি কলকাতা। প্রতি বার প্রচুর মিষ্টি খেয়ে আসি। মুম্বইয়েরবাঙালি বন্ধুদের জন্য তো কলকাতা থেকে লুচি, কষা মাংস, মিষ্টি দই, রসগোল্লা নিয়েওআসতে হয়।